বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে কৃষি খাতের সঙ্গে যুক্ত। শস্য, পশুসম্পদ এবং মৎস্যচাষ এ খাতের অন্তর্ভুক্ত, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অতিবৃষ্টি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, চরম তাপমাত্রা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক বৈরি পরিস্থিতি কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে। ফলে কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্রবীমা একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সঠিক নকশা ও সেবাদানের নতুন নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে, ক্ষুদ্রবীমা প্রকল্পগুলো আর্থিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে সুরক্ষা প্রদান করতে সক্ষম। এ কারণে পেশাজীবী এবং উদ্যোক্তারা এই খাতে আকৃষ্ট হয়েছেন, যারা প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ঝুঁকি সমাধান প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কেএমডির অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থ ও বীমা বিভাগের প্রধান (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বাংলাদেশ) তানভীর রহমান ঢালী জানান যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময়ের আগেই বা অনেক দেরিতে বৃষ্টিপাতের ফলে কৃষকদের ফলন কমে যাচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষকই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নন বা প্রস্তুত নন।
ঢালীর মতে, কৃষকদের জন্য ক্ষুদ্রবীমা একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা। এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য। তিনি বলেন, জলবায়ু ঝুঁকির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সপ্তম দেশ। একটি কার্যকর নীতি কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে ক্ষুদ্রবীমা বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে মাইক্রো ইনস্যুরেন্স কেবল আর্থিক নিরাপত্তাই প্রদান করে না, এটি কৃষকদের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাও তৈরি করে, যা সরকার ও কৃষকদের মধ্যে সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করার পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
কৃষি-প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম উইগ্রোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান জানান, মাত্র ২ হাজার টাকার ক্ষুদ্রবীমা কৃষকদের বিপুল উপকার করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ু পরিবর্তনের সময় এটি তাদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক বন্যায় শুধু মৎস্য খাতেই দেশের প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষুদ্রবীমা প্রকল্পগুলো দুর্যোগ-ত্রাণ তহবিলের ওপর চাপ কমাতে পারে।
মাহমুদুর রহমানের মতে, যদিও কৃষির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অবদান কমছে, তবুও ক্ষুদ্রবীমার বাজার সম্ভাবনা ক্রমবর্ধমান। এ খাতে বেসরকারি বীমা কোম্পানির বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৃষকরা এখনো আর্থিক ঝুঁকি মোকাবেলায় উচ্চ সুদের ঋণদাতাদের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষুদ্রবীমার মাধ্যমে তাদের জন্য সহজলভ্য ও কার্যকর সমাধান আনলে তারা এ ক্ষতিকর কৌশল থেকে সরে আসতে পারবেন। প্রযুক্তির সহায়তায় এই সেবাগুলোকে আরো কার্যকরভাবে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব।
সুইসকন্টাক্টের বিএমএমডিপি প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার নাবা নাশিত তারেক উল্লেখ করেছেন যে প্রকল্পটি মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে পণ্য ডিজাইন এবং গ্রামীণ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী পদ্ধতি প্রচারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সুইসকন্টাক্ট বিভিন্ন উদ্ভাবনী মাইক্রোইনশিওরেন্স পণ্যকে সমর্থন দিয়ে আসছে, যা এরই মধ্যে দেড় লাখেরও বেশি কৃষকের জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদান নিশ্চিত করেছে।
তিনি প্রকল্পের প্রথম পাঁচ বছরের তথ্য তুলে ধরে বলেন, কৃষকদের মধ্যে পরিষেবার জন্য মূল্য পরিশোধের সুস্পষ্ট আগ্রহ দেখা গেছে। তারেক বলেন, বিএমএমডিপি প্রকল্প প্রমাণ করেছে যে বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্ষুদ্রবীমা খাতে লাভজনক ও টেকসইভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ইমপ্যাক্ট বিজনেস বিভাগের প্রধান শুভাশীষ বড়ুয়া বলেন, দেশে বীমার অনুপ্রবেশ মাত্র ১ শতাংশের নিচে। অন্তর্ভুক্তিমূলক বীমার ক্ষেত্রে এ হার আরো কম। তবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ পরোক্ষভাবে বীমার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, শুধু বীমা বিক্রি করলেই আস্থা তৈরি হয় না। গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স কৃষকদের ফসল সংক্রান্ত পরামর্শ, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি সেবা প্রদান করে। গত পাঁচ বছরে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স ৩৩ লাখ কৃষকের কাছে পৌঁছেছে, এবং গত তিন বছরে দেড় লাখের বেশি কৃষক ১৬ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ পেয়েছেন। এটি জটিল আর্থিক পণ্য যেমন বীমা সম্পর্কে কৃষকদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
এছাড়া প্রযুক্তি এ আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণত বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের অভিযোগ পেয়ে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করে। কিন্তু জিডিআইসি এই ধারা উল্টে দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছে। এর ফলে কৃষকদের সম্পৃক্ততা বেড়েছে। সময়মতো দাবি পরিশোধও গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করেছে। তাদের এ প্রচেষ্টা অন্যান্য বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। —বিজ্ঞপ্তি